কাল সর্পদোষ কি ?
জন্মকুণ্ডলীতে যখন সমগ্র গ্রহ রাহু এবং কেতুর মধ্যে যে কোনো একদিকে থাকে তবে এইরূপ অবস্থাকে কাল সর্পযোগ বলা হয়। রাহু এবং কেতুর স্থিতি হিসাবে দ্বাদশ প্রকার কাল সর্পযোগ দেখা যায়। দ্বাদশ প্রকার কাল সর্পযোগ যথাক্রমে
১. অনন্ত কাল সর্পযোগ
২. কুলীক কাল সর্পযোগ
৩. বাসকি কাল সর্পযোগ
৪. শঙ্খপাল কাল সর্পযোগ
৫. পদ্ম কাল সর্পযোগ
৬. মহাপদ্ম কাল সর্পযোগ
৭. তক্ষক কাল সর্পযোগ
৮. কর্কট কাল সর্পযোগ
৯. শঙ্খচূড় কাল সর্পযোগ
১০. ঘাতক কাল সর্পযোগ
১১. বিষধর কাল সর্পযোগ
১২. শেষনাগ কাল সর্পযোগ
কাল সর্পযোগের ফলে দৈনন্দিন জীবনে কি কি ধরনের অশান্তির সম্মুখীন হতে হয় ?
জাতকের জন্মকুণ্ডলীতে কাল সর্পযোগ থাকা জাতকের জীবনে বিষন্নতার কারণ। জাতকের সামাজিক, পারিবারিক এবং আর্থিক জীবনে কাল সর্পদোষের কারণে অনেক প্রকার অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। পূর্ণ পরিশ্রম সত্ত্বেও কাঙ্খিত সফলতা পান না। এ ছাড়াও ভাগ্যোদয়ে বাধা, সন্তান সুখে বাধা, গৃহে অশান্তি, ধনপ্রাপ্তিতে বাধা, কাজে মন না লাগা, মৃত্যুভয় পাওয়া, খারাপ স্বপ্ন দেখা, পরিশ্রমের ফল না পাওয়া ইত্যাদি কাল সর্পদোষের কারণে হয়ে থাকে। একই কারণে মানুষের জীবন প্রায়শই সংঘর্ষময় ও হতাশাজনক হয়ে থাকে।
বিভিন্ন প্রকার কাল সর্পদোষের ফলভুক্তি :-
১. অনন্ত কাল সর্পযোগ :-
প্রথম ঘরে রাহু সপ্তম ঘরে কেতু অবস্থান করলে এবং বাকি সব গ্রহ রাহু এবং কেতুর বাঁদিকে অবস্থান করলে যে কাল সর্পযোগের সৃষ্টি হয় তাকে অনন্ত কাল সর্পযোগ বলে। এই কাল সর্পযোগের ফলে সময় বিশেষে জাতকের জুয়া বা লটারিতে অর্থ প্রাপ্তি ঘটতে পারে। এদের বৈবাহিক জীবনে অশান্তি ঘটবে। মিথ্যা অপযশ এদের জীবনে নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়াবে। মকর লগ্ন বাদে সকল লগ্ন ও রাশির জাতক-জাতিকারা এই কাল সর্পদোষের
কারণে দুঃখ পাবে।
২. কুলীক কাল সর্পযোগ :-
দ্বিতীয় ঘরে রাহু ও অষ্টম ঘরে কেতু থাকা অবস্থায় বাকি সকল গ্রহ রাহু এবং কেতুর বাঁদিকে অবস্থান করলে যে যোগ সৃষ্টি তাকে কুলীক কাল সর্পযোগ বলে। এই যোগের ফলে জাতকের স্বাস্থহানী ঘটে। অকারণে রোগ-ভোগ লেগেই থাকে। জাতক জাতিকারা সর্বদা অবসাদে ভোগে। ব্যয় বৃদ্ধি ঘটে, কর্মে স্থিতাবস্থা থাকে না, আর্থিক কষ্টের কারণে জাতক জাতিকার অপঘাতে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে বৃষ লগ্নের জাতক জাতিকাদের এই কুলীক কাল সর্পযোগ সুফল প্রদান করে।
৩. বাসকি কাল সর্পযোগ :-
তৃতীয় ঘরে রাহু ও নবম ঘরে কেতু অবস্থান করলে এবং বাকি সব গ্রহ রাহু এবং কেতুর বাঁ দিকে অবস্থিত হলে যে যোগসৃষ্টি হয় তাকে বাসকি কাল সর্পযোগ বলে। এই ধরণের যোগে জাতক জাতিকার পারিবারিক অশান্তি, পিতামাতার স্বাস্থহানী, আর্থিক উন্নতিতে বাধা, ব্যবসাবৃদ্ধি বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকে। দাম্পত্য কলহের কারণে জাতক জাতিকার জীবন দুর্বিষহ হয়ে থাকে। কিন্তু মেষ লগ্নের জাতক জাতিকার এই যোগে জীবনে সাফল্য লাভ করে।
৪. শঙ্খপাল কাল সর্পযোগ :-
চতুর্থ ঘরে রাহু এবং দশম ঘরে কেতু অবস্থান করলে ও বাকি সব গ্রহ রাহু এবং কেতুর বাঁদিকে থাকলে ওই যোগকে শঙ্খপাল কাল সর্পযোগ বলা হয়। এই ধরণের জাতক জাতিকার সব কাজ একসঙ্গে করার কারণে কোনো কাজই সম্পূর্ণ করতে পারে না। এই ধরণের জাতক জাতিকার জীবন ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই লগ্নের জাতক জাতিকারা সর্বদা ভয়মুক্ত জীবন যাপন করে থাকে। তবে ধনু লগ্নের জাতক জাতিকারা যদি এই যোগ প্রাপ্ত হয় তবে বহু ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারবে।
৫. পদ্ম কাল সর্পযোগ :-
পঞ্চম ঘরে রাহু ও একাদশ ঘরে কেতু অবস্থান করলে এবং বাকি সব গ্রহ রাহু ও কেতুর বাঁদিকে থাকলে সেই যোগকে পদ্ম কাল সর্পযোগ বলে। এই যোগের কারণে জাতক জাতিকার সন্তানসুখ হয় না। সন্তানের সাথে মনোমালিন্য লেগেই থাকে। জাতক জাতিকার নামের সম্পত্তি বেদখল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এঁদের জীবন শত্রূদ্বারা বেষ্টিত থাকবে। মেষ বা বৃশ্চিক রাশির জাতক জাতিকারা রাজনীতিতে সফল হবেন।
৬. মহাপদ্ম কাল সর্পযোগ:-
ষষ্ঠ ঘরে রাহু ও দ্বাদশ ঘরে কেতু অবস্থান করলে এবং বাকি সব গ্রহ রাহু ও কেতুর ডানদিকে থাকলে তাকে মহাপদ্ম কাল সর্পযোগ বলে। এই ধরণের জাতক জাতিকারা ভীষণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে থাকেন। এঁরা সাধারণত প্রেমে প্রত্যাখাত হন। এঁদের জীবন সর্বদা শত্রূ পরিবৃত হয়ে থাকে। এঁদের কারাবাসের সম্ভাবনাও দেখা যায়। যদি জাতক জাতিকা মকর লগ্নের হন তাহলে ওকালতিতে এবং রাজনীতিতে সফলতা লাভ করবেন।
৭. তক্ষক কাল সর্পযোগ :-
সপ্তম ঘরে রাহু এবং প্রথম ঘরে কেতু অবস্থান করলে এবং বাকি সমস্ত গ্রহ রাহু-কেতুর ডানদিকে অবস্থান করে তাকে তক্ষক কাল সর্পযোগ বলে। এই ধরণের জাতক জাতিকারা খুব লোভী প্রকৃতির হন। অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে অনৈতিক পথ অবলম্বন করে থাকেন। দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না। এই যোগের কারণে জাতকের প্রচুর শত্রূ থাকে।
৮. কর্কট কাল সর্পযোগ :-
অষ্টম ঘরে রাহু এবং দ্বিতীয় ঘরে কেতু অবস্থান করলে আর অন্য সব গ্রহ রাহু-কেতুর ডানদিকে থাকে তাকে কর্কট কাল সর্পযোগ বলে। এই ধরণের জাতক জাতিকারা খুব কলহপ্রিয় হন। এঁদের কাজের কোনো স্থিরতা থাকে না। এঁরা অন্যদের দ্বারা প্রতারিত হয়।
৯. শঙ্খচূড় কাল সর্পযোগ :-
নবম ঘরে রাহু এবং তৃতীয় ঘরে কেতু অবস্থান করলে আর বাকি সব গ্রহ রাহু-কেতুর ডানদিকে থাকলে তাকে শঙ্খচূড় কাল সর্পযোগ। এই ধরনের জাতক জাতিকারা নিজেদের ঢাক নিজেরাই পেটান। অনর্গল অসংলগ্ন কথা বলেন। সর্বদাই মিথ্যার আশ্রয় নেন। ফলে এঁদের জীবন উত্থান-পতনে ভরা থাকে।
১০. ঘাতক কাল সর্পযোগ :-
দশম ঘরে রাহু চতুর্থ ঘরে কেতু অবস্থান করলে আর বাকি সব গ্রহ রাহু এবং কেতুর ডানদিকে থাকলে তাকে ঘাতক কাল সর্পযোগ বলে। এই ধরনের জাতক জাতিকারা পরিবারের কাছে অপ্রিয় হন। এঁরা রাজরোষে পড়েন। তবে সিংহ বা কন্যা লগ্ন হলে এঁরা জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
১১. বিষধর কাল সর্পযোগ :-
একাদশ ঘরে রাহু ও পঞ্চম ঘরে কেতুর অবস্থান এবং অন্য সব গ্রহ রাহু এবং কেতুর ডানদিকে থাকলে তাকে বিষধর কাল সর্পযোগ বলে। এই ধরণের জাতক জাতিকারা বয়সকালে উন্নতি এবং সন্তান সুখে বাধা দেখা যায়। স্নায়ুজনিত সমস্যায় এঁদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে ওঠে।
১২. শেষনাগ কাল সর্পযোগ:-
দ্বাদশ ঘরে রাহু এবং ষষ্ঠ ঘরে কেতুর অবস্থান আর বাকি সব গ্রহ রাহু-কেতুর বাঁদিকে অবস্থান করলে তাকে শেষনাগ কালসর্প দোষ বলে।এই ধরনের জাতক জাতিকার অকারণে প্রচুর শত্রূর জন্ম নেয়। যারা সবসময় এঁদের ক্ষতির চেষ্টা করে। মামলা মোকাদ্দমা, লড়াই, ঝগড়া অশান্তিতে সর্বদা ব্যস্ত থাকে।
কাল সর্পযোগে প্রভাবিত জাতক জাতিকার মানসিকতা সাধারণ মানুষের থেকে অনেক উচ্চ মার্গের হয়ে থাকে। যদি এঁরা এই গুণের শুভ প্রয়োগ করেন তবে জাতক জীবনে প্রতিষ্ঠা অর্জন করবে।
কাল সর্পযোগের দ্বারা প্রভাবিত জাতক জাতিকার প্রতিকারের উপায়:-
শাস্ত্র ও বিধিসম্মত উপায়ে ত্রম্বকেশ্বর মন্দিরে শুদ্ধভাবে পূজা দেওয়া। এছাড়া কাল সর্পদোষ পরিহারের জন্য সর্প দেবতাকে মনে করে নাগ দেবীর পূজা করা। সিদ্ধ তান্ত্রিকদ্বারা মহামৃত্যুঞ্জয় কবজ ধারণ এবং প্রত্যহ শিবের আরাধনা শাস্ত্রমতে সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় বলে পরিগণিত হয়ে থাকে।

Reviews
There are no reviews yet.